সাঁওতাল বিদ্রোহের মতো মুন্ডারাও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে মহাজন-বিরোধী সংগ্রামের সূচনা করেছিল। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে এরা যে উলগুলান এর সূচনা করেছিল তা অন্যান্য উপজাতি বিদ্রোহ কিছুটা আলাদা ছিল। সাঁওতাল ,কোন, হো প্রকৃতি উপজাতির মতো মুন্ডারাও ছিল ভারতের আদিম আদিবাসী। ছোটনাগপুর, ওড়িশা, বাংলার পশ্চিম দিকের কিছু অঞ্চলে তারা বসবাস করত।
বিদ্রোহের বৈশিষ্ট্য:
১. মুন্ডা বিদ্রোহের চিত্র ছিল ওপনিবেশিকতা-বিদ্রোহী। কুমার সুরেশ সিং তার 'The Dust-Storm and the Hanging Mist'গ্রন্থি দেখিয়েছেন যে, যৌথ মালিকানা ছিল মুন্ডাদের কৃষি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তাদের যৌথ মালিকানা অবসান ঘটিয়ে নতুন ভূমির ব্যবস্থা চালু করে।
২. উপনিবেশিক শতকের জমিদার এবং মহাজন' বিরোধী বিদ্রোহ হিসেবে এই বিদ্রোহের পরিচিত ছিল।
৩. যুগে যুগে ধরে এদের সমাজে যে 'কুন্তকট্টি 'প্রথা বর্তমান ছিল তার পরিবর্তন ঘটিয়ে 'জমিদারি ' ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে সম্পূর্ণ অপরিচিত এবং অন্যায় এই প্রথার বিরুদ্ধে মুন্ডা বিদ্রোহ করে।
৪. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণে বহিরাগত মধ্যভাগে দিকুদের অত্যাচারে এবং শোষণে এদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে।
৫. বিনা মজুরিতে বা 'বেঠবেগারি ' খাজনা, বিভিন্ন রকমের সেস-এর বিরুদ্ধে এরা প্রতিবাদ জানাতে থাকে।
৬. মুন্ডা সমাজের উপর নানা ধরনের অবিচার খ্রিস্টান পাদরিদের ধর্মান্তরিত করণের চেষ্টা বিরুদ্ধে এরা সংবদ্ধ হয়।
৭.রেললাইন স্থাপন এবং আসামের চা বাগানগুলোতে কাজের জন্য সরকার এবং বিভিন্ন কোম্পানি এদের জোর করে নিয়োগ করে। উপযুক্ত পারিশ্রমিক না দিয়ে এদের ওপর ইংরেজ কর্মচারীরা অত্যাচার করতে থাকে।
৮. ব্রিটিশ সরকার নতুন বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তন করার ফলে তাদের আদিম বিচার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে মুন্ডাদের গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে চোলাই মদের দোকান। এগুলোর মালিক ছিল দিকরা। মোদের প্রতি আসক্তি উপজাতিদের নৈতিকতাবোধকে নষ্ট করে দেয়।
৯. তাদের স্লোগান ছিল 'হয় সরকারকে খাজনা নয় তো নয়'। এইসকল চিত্র ও বৈশিষ্ট্যগুলি মুন্ডাদের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধের পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব :
বিদ্রোহী নেতৃত্ব দেন বিরসা মুন্ডা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিরসা প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে। মনটা জনসাধারনের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন ভগবান। স্বাধীন মুন্ডার রাজ্য প্রতিষ্ঠা ছিল তার আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এই উদ্দেশ্যে বিরসা সরকারের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে। বিরসা মন্ডার নেতৃত্বে মুন্ডারা জমিদার, মহাজন, পুলিশ ও ইংরেজদের উপর আক্রমণ চালায়। সরকার বিদ্রোহ দমন করার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ করে। ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ৯ জানুয়ারি মুন্ডা বাহিনী পরাজিত হয়। অনেক মুন্ডার যোদ্ধা বিদ্রোহে প্রাণ হারায়। বিরসা সহ অনেকে বন্দি হয়। ৯ জুন মাত্র ২৫ বছর বয়সে বিরসা রাঁচির জেলে কলেরা রোগে মারা যায়। এর পরেই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।
বিশ্লেষণ:
আপাতদৃষ্টিতে বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও এর ফল ছিল সুদূপ্রসারী-
১.সরকার ছোটনাগপুরের প্রজাস্বত্ব আইন (১৯০৮)দ্বারা বেঠবেগারি প্রথা অবসান ঘটায়।
২.১৯০২-১০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মুন্ডাদের পারিবারিক জমি জরিপের ব্যবস্থা হয়।
৩. মুন্ডা বিদ্রোহের উৎসাহিত হয়ে তানা ভগতের এর নেতৃত্বে ছোটনাগপুর অঞ্চলের হো রা ১৯১৪ সালে আন্দোলনের সূচনা করে।
৪. মুন্ডা বিদ্রোহের পর মুন্ডা মুন্ডা সমাজে বিরসা সম্প্রদায় নামে একটি নতুন শ্রেণীর জন্ম হয়।
1 Comments
Nice 👍
ReplyDeleteThanks you ☺️